নিজস্ব প্রতিবেদক, শরীয়তপুর:
শরীয়তপুরের রাজনীতির মাঠে আবারও আলোচনায় এসেছে জেলা বিএনপির নেতৃত্বের প্রশ্ন। দীর্ঘদিন ধরে জেলা কমিটি ঘিরে নানা আলোচনা, মতপার্থক্য ও সাংগঠনিক টানাপোড়েনের মধ্যে তৃণমূলের একটি অংশ চাইছে মাঠের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত, পুরোনো ও অভিজ্ঞ নেতাদের মধ্য থেকে নেতৃত্ব বেছে নেওয়া হোক। সেই আলোচনায় উঠে আসছে জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক টিআইএম মহিতুল গনি মিন্টু সরদারের নাম।
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের একাংশের দাবি, মহিতুল গনি মিন্টু সরদার দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, দলের কঠিন সময়েও মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ ধরে রাখা এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার কারণে তাঁর প্রতি কর্মীদের একটি অংশের আস্থা তৈরি হয়েছে।
২০১২ সালে ঘোষিত শরীয়তপুর জেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে টিআইএম মহিতুল গনি মিন্টু সরদারকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছিল। সে সময় মো. সফিকুর রহমান কিরন সভাপতি এবং সরদার একেএম নাসির উদ্দিন কালু সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
সাংগঠনিক সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার মধ্য দিয়ে জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক যোগাযোগ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়েও বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাঁকে সক্রিয় দেখা গেছে। ২০২৫ সালের গোসাইরহাটে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তাঁকে জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এবং গোসাইরহাট উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
মাঠের নেতাকর্মীদের কাছে ‘পরিচিত মুখ’
রাজনীতির বড় মঞ্চের আলো অনেক সময় গ্রামের অন্ধকার উঠান পর্যন্ত পৌঁছায় না। কিন্তু সংগঠনের প্রকৃত শক্তি তৈরি হয় সেই উঠান, হাট, বাজার, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কর্মীদের হাত ধরে। শরীয়তপুরের বিএনপির তৃণমূলের একটি অংশ মনে করে, জেলা নেতৃত্ব নির্ধারণের সময় মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তাঁদের ভাষ্য, মহিতুল গনি মিন্টু সরদারকে ঘিরে তৃণমূল পর্যায়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার পেছনে রয়েছে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা।
সাম্প্রতিক সময়েও বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাঁর উপস্থিতির খবর এসেছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনী কর্মসূচিতেও তাঁকে জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁকে কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা গেছে।
নেতৃত্বের প্রশ্নে সামনে আসছে তৃণমূল
শরীয়তপুরের জেলা বিএনপির নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন জেলার রাজনীতিতে সাংগঠনিক সমন্বয় ও নেতৃত্বের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথম আলোর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জেলা বিএনপির কমিটি দীর্ঘদিন গঠিত না হওয়া এবং নেতৃত্ব নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিরোধের কথা উঠে এসেছে।
এমন পরিস্থিতিতে তৃণমূলের একটি অংশ মনে করছে, নেতৃত্বের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পরিচিতির পাশাপাশি সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, মাঠের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মীদের সমন্বয় করার সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
মহিতুল গনি মিন্টু সরদারের সমর্থক বলে পরিচিত কয়েকজন নেতাকর্মীর বক্তব্য, দীর্ঘদিন রাজনীতিতে থাকার কারণে জেলার বিভিন্ন এলাকার কর্মীদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় রয়েছে। তাঁদের প্রত্যাশা, নতুন জেলা কমিটি গঠনের সময় তৃণমূলের মতামতও যেন গুরুত্ব পায়।
রাজনীতির বাইরে মানুষকে কাছে রাখার প্রশ্ন
একজন রাজনৈতিক নেতার পরিচয় শুধু পদ-পদবিতে সীমাবদ্ধ নয়—তৃণমূলের কর্মীদের কাছে তাঁর মূল্যায়নের বড় জায়গা হলো ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও দুঃসময়ে পাশে থাকার স্মৃতি। রাজনৈতিক কর্মসূচির ব্যস্ততার বাইরে কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখা, স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যা শোনা এবং সাংগঠনিক বিষয়ে যোগাযোগ রাখা—এসব বিষয়ই মাঠের রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
মহিতুল গনি মিন্টুকে ঘিরে তৃণমূলের আগ্রহের ক্ষেত্রেও এমন মানবিক সম্পর্কের কথাই সামনে আনছেন তাঁর প্রতি আস্থাশীল নেতাকর্মীরা। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক সংগঠনে পদ পরিবর্তন হতে পারে, কমিটি পরিবর্তন হতে পারে; কিন্তু কর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক সহজে তৈরি হয় না।
তবে এসব বক্তব্য মূলত তৃণমূলের একটি অংশের মতামত। তাঁকে ঘিরে সব নেতাকর্মীর একই মত রয়েছে—এমন দাবি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করার মতো পূর্ণাঙ্গ জরিপ বা দলীয় নথি প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
সিদ্ধান্ত দলীয় প্রক্রিয়ায়
জেলা বিএনপির নেতৃত্বে কে আসবেন, সেটি শেষ পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্ত ও সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার বিষয়। তৃণমূলের কোনো অংশের প্রত্যাশা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মতামত হলেও সেটিকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে এটুকু স্পষ্ট—শরীয়তপুর বিএনপির নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনায় তৃণমূলের মতামত ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। আর সেই আলোচনায় সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মহিতুল গনি মিন্টু সরদারের নামও উচ্চারিত হচ্ছে।
একদিকে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ—এই দুই বিষয়কে সামনে রেখে তাঁকে নিয়ে তৃণমূলের একটি অংশের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
শরীয়তপুর বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের কাঠামো কী হবে, তা নির্ধারণ করবে দলীয় প্রক্রিয়া। কিন্তু মাঠের কর্মীদের আলোচনায় যে প্রশ্নটি ইতোমধ্যেই জায়গা করে নিয়েছে, সেটি হলো—নতুন নেতৃত্বে তৃণমূলের কণ্ঠ কতটা প্রতিফলিত হবে?
আর সেই প্রশ্নের আলোচনায় মহিতুল গনি মিন্টু সরদারের নাম উঠে আসা শরীয়তপুরের বিএনপির অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের সমীকরণে একটি লক্ষণীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

No comments:
Post a Comment