![]() |
| বিনিয়োগে ‘আশিক ম্যাজিক’ কোথায়? বাস্তবতা ও প্রত্যাশার ফারাক |
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে বিদেশ থেকে নিয়োগ পান আশিক চৌধুরী। তরুণ, উচ্চশিক্ষিত ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই অর্থনীতিবিদকে ঘিরে শুরুতে বিনিয়োগ অঙ্গনে বড় ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়। সরকার পরিবর্তনের পর বিনিয়োগে স্থবিরতা কাটিয়ে দেশকে নতুন করে বিনিয়োগবান্ধব পথে নেওয়ার দায়িত্ব পড়ে তাঁর কাঁধে।
দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই আশিক চৌধুরী বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেন। ব্যবসা পরিচালনার সহজতা বাড়ানো, দুর্নীতি কমানো এবং তথ্যভিত্তিক বিনিয়োগ কৌশলের কথা তুলে ধরেন। বিডার পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয় এফডিআই হিটম্যাপ। চলতি বছরের এপ্রিলে ঢাকায় চার দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়, যেখানে ৫০টি দেশের চার শতাধিক প্রতিনিধি অংশ নেন। সম্মেলন শেষে প্রায় ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়ার ঘোষণাও দেওয়া হয়।
তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সরকারি পরিসংখ্যান ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচক বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নতুন বিনিয়োগের গতি এখনো আসেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) বেড়ে ১৬৯ কোটি ডলারে পৌঁছালেও এর বড় অংশ এসেছে বিদ্যমান বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পুনর্বিনিয়োগ করা মুনাফা এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ঋণ থেকে। নতুন বিদেশি ইকুইটি বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ৫৫ কোটি ডলার, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এমনকি করোনাকালেও নতুন বিনিয়োগ এর চেয়ে বেশি ছিল।
বিডায় নিবন্ধিত বিনিয়োগ প্রস্তাবের চিত্রও উদ্বেগজনক। অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিডায় নিবন্ধিত মোট বিনিয়োগ প্রস্তাব ছিল ৬৬ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫৮ শতাংশ কম। একই সময়ে দেশি বিনিয়োগ প্রস্তাবেও বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে।
অন্যদিকে সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশের সূচকগুলোও চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগের হার কমে দাঁড়িয়েছে ২২.৪৮ শতাংশে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২৩.৫১ শতাংশ। একই সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে প্রায় ১৯ শতাংশ। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ছয় মাস ধরে ৭ শতাংশের নিচে রয়েছে, যেখানে এর আগে তা ১০ শতাংশের বেশি ছিল।
বিনিয়োগকারীরা বলছেন, রাজনৈতিক সরকারের অনুপস্থিতি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতা, উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট এবং ব্যাংক খাতের আস্থাহীনতা বিনিয়োগে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মতে, স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাই যখন পুঁজি বিনিয়োগে সতর্ক অবস্থানে, তখন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেছেন, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী দেশগুলোতে সাধারণত এফডিআই নেতিবাচক হয়ে পড়ে। সে তুলনায় বাংলাদেশে নিট বিনিয়োগ বেড়েছে, যা ইতিবাচক। তাঁর দাবি, ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে এফডিআই প্রায় ৮০ শতাংশ বেড়েছে এবং বিদ্যুৎ, ব্যাংকিং ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ প্রবাহ দেখা যাচ্ছে।
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পরিসংখ্যানগত কিছু উন্নতি থাকলেও কাঠামোগত সংস্কার ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, জমি, জ্বালানি, ব্যাংকঋণের সুদহার ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা—এই সবগুলো বিষয় একসঙ্গে সমাধান না হলে বিনিয়োগে টেকসই গতি আসবে না।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ যেখানে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলারের এফডিআই পেয়েছে, সেখানে ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের বিনিয়োগ প্রবাহ ছিল তার বহু গুণ বেশি। এমনকি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানও এফডিআইয়ে বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গেছে।
আশিক চৌধুরীর নেতৃত্বে বিনিয়োগ খাতে উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার ঘাটতি না থাকলেও বাস্তব বিনিয়োগ প্রবাহ ও কাঙ্ক্ষিত কাঠামোগত সংস্কার নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বিনিয়োগের গর্জন যতটা শোনা যাচ্ছে, বাস্তবে তার প্রতিফলন এখনো সীমিত এমন মূল্যায়নই উঠে আসছে সংশ্লিষ্ট মহলের বিশ্লেষণে।

No comments:
Post a Comment