![]() |
মিয়ানমারে বিমান হামলা, নিহত ১৭০ |
মিয়ানমারে সামরিক জান্তা সমর্থিত বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনের ভোট গ্রহণ চলাকালীন দেশটির বিমান বাহিনীর ভয়াবহ অভিযানে অন্তত ১৭০ জন নিহত হয়েছেন। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের দীর্ঘ পাঁচ বছর পর আয়োজিত এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিদ্রোহী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ব্যাপক সহিংসতা চালিয়েছে সামরিক সরকার।
শনিবার জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিন দফায় চলা এই নির্বাচনের সময়কালে মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চলে অন্তত ৫০৮টি ছোট-বড় বিমান হামলা পরিচালনা করা হয়েছে। এই হামলায় সাধারণ নাগরিকদের পাশাপাশি কয়েকজন প্রার্থীরও মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলে এই নির্বাচনকে সামরিক বাহিনীর সাজানো একটি ‘সাজানো নাটক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী গত ২৫ জানুয়ারি ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে এবং চূড়ান্ত গণনায় জান্তা সমর্থিত দল ইউনিয়ন অ্যান্ড সলিডারিটি পার্টি (ইউএসডিপি) নিরঙ্কুশ জয় লাভ করেছে। তবে দেশের ১২১টি আসনে ভোট গ্রহণের কোনো পরিবেশ না থাকায় সেসব এলাকায় নির্বাচন স্থগিত রাখা হয়েছিল।
জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনের মিয়ানমার শাখার প্রধান জেমস রোডেহ্যাভের জানিয়েছেন যে, ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া এই বিমান অভিযান ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত একটানা অব্যাহত ছিল। মূলত বিরোধী কণ্ঠরোধ এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোতে ভীতি প্রদর্শন করতেই এই রক্তক্ষয়ী পথ বেছে নিয়েছে সেনাবাহিনী। এই সামরিক অভিযানের ফলে মিয়ানমারের সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক এই নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করে বলেছেন যে, বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে এটি মূলত সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা কুক্ষিগত করার একটি প্রহসন মাত্র। সঠিক ভোটার তালিকা বা বিরোধী দলের কার্যকর অংশগ্রহণ ছাড়া আয়োজিত এই নির্বাচন আন্তর্জাতিক কোনো মানদণ্ডই পূরণ করতে পারেনি।
সামরিক জান্তা নিয়ন্ত্রিত এলাকায় জোরপূর্বক ভোট আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, বিমান হামলায় হতাহতের যে সংখ্যা পাওয়া গেছে তা কেবল নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভিত্তিতে তৈরি, তবে দুর্গম এলাকাগুলোতে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে মিয়ানমারের এই একতরফা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনের মাধ্যমে বৈধতা পাওয়ার এই চেষ্টা বিশ্বজুড়ে মিয়ানমার জান্তাকে আরও বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। অধিকাংশ দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এই নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করার ইঙ্গিত দিয়েছে।
বিশেষ করে বিমান হামলায় এত বিশাল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি মিয়ানমারের বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্রই ফুটিয়ে তুলছে। জান্তা সরকারের পক্ষ থেকে এই জয়কে স্বাগত জানানো হলেও সাধারণ জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রতিরোধ অব্যাহত রয়েছে।
জান্তার বিমান হামলার রসদ যোগাচ্ছে ইরান?
আর অল্প কয়েকদিন পরেই মিয়ানমারে জেনারেল মিন অং হ্লাইং এর নেতৃত্বে সামরিক জান্তা সরকারের পাঁচ বছর পূরণ হতে চলেছে। ২০২১ সালে তৎকালীন বেসামরিক সরকার প্রধান অং সান সুচিকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের পর থেকে একদণ্ডও শান্তিতে থাকতে পারেনি জান্তা।
প্রায় এক দশক গণতন্ত্রের সুখছায়ায় থাকা মিয়ানমারের সাধারণ মানুষ 'কারচুপির' অতিরঞ্জিত দায় দেখিয়ে ঘটানো ক্যু মেনে নেয়নি। শুরুতে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ শুরু হলে তা দমন-পীড়নের মাধ্যমে বন্ধের চেষ্টা চালায় জান্তা। কিন্তু তাতেও দমেনি গণতন্ত্রকামী জনগণ।
এরপর বিভিন্ন ছোট ও মাঝারি নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়গুলো একতাবদ্ধ হয়ে সশস্ত্র সংগ্রামে নেমে পড়ে। একের পর এক শহরের দখল হারিয়ে নাস্তানাবুদ ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে সেনাবাহিনী।
এক পর্যায়ে দেশের অর্ধেকেরও বেশি এলাকার দখল জেনারেল মিন অং হ্লাইং-এর হাত থেকে ছুটে যায়।
বিদ্রোহীদের নিরবচ্ছিন্ন হামলায় পিছু হটতে বাধ্য হয় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। কিন্তু হঠাৎ করেই আবার ঘটনার মোড় ঘুরতে শুরু করে। নবোদ্যমে বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও তাদের সমর্থকদের ওপর নির্বিচারে বিমান হামলা শুরু করে সামরিক জান্তা। এই 'ঘুরে দাঁড়ানোর' বিষয়টি নিয়ে চলে ব্যাপক আলোচনা।
পশ্চিমা দেশগুলো মিয়ানমারের জান্তার কাছে অস্ত্র ও তেল সরবরাহের ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করলেও কোনো এক অলৌকিক উপায়ে তারা রসদ পেতে থাকে। নতুন করে আবারও বেশ কিছু এলাকার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় সামরিক শাসক।
এর মাঝে নতুন এক তদন্ত প্রতিবেদনে জানা গেছে, ইরানের ‘ভুতুড়ে জাহাজে’ করে তেল আসছে মিয়ানমারে।
মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও রয়টার্সের এক যৌথ তদন্তে জানা গেছে, মিয়ানমারের গণতন্ত্রকামী জনগণ ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সদস্য, উভয়ের ওপর প্রাণঘাতী বিমান হামলার তেল যোগাচ্ছে তেহরান।
মিয়ানমারের সর্বশেষ নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক সরকারের সাবেক সদস্যদের নিয়ে গঠিত ছায়া-সরকার ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি) -এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জান্তা দুই হাজার ৫০০টি বিমান হামলা চালায়। এসব হামলায় এক হাজার ৭০০ জন নিহত হন।
২০২৫ সালে আকাশপথে আসা হামলার সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে দাঁড়ায়। গত বছর পাঁচ হাজার ৬০০ হামলায় মিয়ানমারের দুই হাজার ২০০ নাগরিক নিহত হন।
অ্যামনেস্টি বলছে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী রাশিয়া, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার কাছ থেকে নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কৌশল ধার নিয়েছে।
ইরান থেকে ‘ভুতুড়ে জাহাজে’ করে উড়োজাহাজের জ্বালানি আসছে মিয়ানমারে। এসব নৌযাত্রা চলাকালীন সময় জ্বালানিবাহী জাহাজগুলো তাদের স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ রাডার (এআইএস) বন্ধ রাখে। যার ফলে নৌযান চলাচলের আনুষ্ঠানিক রেকর্ডে তাদের কোনো হদিস থাকে না।
তদন্ত প্রতিবেদন মতে, ২০২৪ সালের জুলাই মাস থেকে বেশ কয়েক দফায় মিয়ানমারে উড়োজাহাজের জ্বালানি আসার বিষয়টি চিহ্নিত করা হয়েছে।

No comments:
Post a Comment